মালেক ইকবাল।।
রাত ৩ঃ১৯ মিনিট। চারিদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা।সারাদিনের ক্লান্তি শেষে শরীরটা আর পারছে না। সবাই কোরিয়ান কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। শুনশান নিরাবতা। আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ। কম্বল থেকে মুখ বের করলে আওয়াজটা স্পষ্ট। দরজা খুলে দেখলাম ভিয়েতনামের মেয়েটা হোটেলের করিডরে বসে পাইপ টানছে। পাইপের ধোঁয়া কুয়াশায় মিশে একাকার। করিডোরটা বেশ বড়। মাঝখানে শুধু একটা ডিম লাইট জ্বলছে। আবারও সেই আওয়াজ। ভাবলাম হোটেলের কেউ তিন তলা থেকে চার তলা আসছে। তাকে দেখে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম- আরে আপনি এখানে, এত রাতে! ডান হাতের দুই নম্বর আঙুলটা ঠোঁটের উপর রেখে ফিসফিস করে বললেন- প্লিজ, আস্তে কথা বলুন। আমি এখানে আসছি আমার রুমের কেউ জানে না। তার আগে বলুন আপনি এখনো ঘুমাননি কেন? মাথাটা ঝুকে আস্তে করে বললাম- ঘুম কি খুব সস্তা জিনিস নাকি? যে চাইলেই আসবে? একটু অভিমানের সুরে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি ক্যাম্নে পারেন এসব! সারাদিন এত এত প্যারা নেন। তারপরও এখনো জেগে আছেন!

কিছু না বলে দুজনই কিছুক্ষণ নিরব থাকলাম। হয়ত তিনি কিছু ভাবছেন। প্রচন্ড শীতের মধ্যে গায়ে কাশ্মীরী চাদর ছাড়া তেমন কোন ভাড়ী পোশাক নেই। কানটুপি রাখতে পারতো। তবে চাদর দিয়ে মাথার উপর হাফ ঘোমটা। চোখের ভ্রুরুর উপর কুয়াশা লেগে আছে। অন্ধকারে ছোট্ট তিলটা দেখা যাচ্ছে না। তার পায়ের দিকে তাকাতেই চমকে উঠে বললাম-আরে আপনার পায়ে সেন্ডেল কই, শুধু মোজা কেন? একটু বিষন্ন হয়ে বললেন -সেন্ডেল পার্সে রাখছি। এই নিরব রাতে সেন্ডেল পায়ে হাটলে খটখট শব্দ হয়। এই জন্য শুধু মোজা পায়ে হাটছি। কেউ টের পেলে কি হবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম- এত রাতে শীতের মধ্যে কেন আসছেন? দু পা সামনে এগিয়ে কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন- সিনেম্যন আইস্ক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে। তাই আসলাম।
-এই শীতের মধ্যে এত রাতে আইস্ক্রিম!
– না, শুধু আইস্ক্রিম না, এটা হট রেড সিনেম্যন আইস্ক্রিম।

এই বলে ডান হাতটা ধরে সামনের দিকে এগিয়ে চললেন। সাবধানে পা টিপে টিপে হাটছেন। ম্যামের রুমের আলো জানালা দিয়ে কুয়াশার সাথে মিশে যাচ্ছে। বাম দিকে মোড় নিতেই আমার ডান হাতটা জানালার সাথে লেগে হাল্কা শব্দ হলো। ভয়ে দুজনেই ফ্লোরের উপর বসে পরলাম। যদি কেউ দেখে ফেলে। ম্যাম আড়মোড়া দিয়ে আবার ঘুমিয়ে গেলেন। মাথা কিছুটা নিচু করে চোরের মতো দু’জন নিচে চলে আসলাম। গার্ডকে বললাম দিল্লি স্টেশনে একজন আসছে তাকে রিসিভ করতে হবে। এটা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। গার্ডের হাসির কারণটা বোঝার চেষ্টা করলাম না। হোটেল থেকে বের হয়ে আধা মাইল অব্দি হাটলাম। দিল্লি স্ট্রিট একদম ফাকা। মাঝেমাঝে দু একটা কুকুর শীতে জুবুথুবু হয়ে শুয়ে আছে।

স্ট্রিট লাইটের আলোয় রাস্তা কোন মতো দেখা যাচ্ছে। কুয়াশা মেঘের মতো উড়ে যাচ্ছে। শুধু হাটছি। মুখে কোন কথা নাই। তাকে খুবই মলিন দেখাচ্ছে। শীতে কাপছে। মাঝেমধ্যে দাঁতে দাঁত সংঘর্ষ হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম- কী হয়েছে, আপনি এমন করছেন কেন? কোন উত্তর নেই। আরে আপনি এখনো সেন্ডেল পরেন নি। আজব তো। এটা শুনে কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। মনে হলো এতক্ষণ ধরে এই কথাটাই শুনতে চাচ্ছিলেন। পার্স থেকে সেন্ডেল বের করে পরতে চেষ্টা করলেন। মোজা একদম ভিজে গেছে। পায়ে রাখার উপায় নেই। আমার পায়ে শু ছিল। সেখান থেকে পা খুলে আমার মোজাটা দিতেই অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, আপনি কী সত্যিই..? প্রশ্নটা বুঝলাম, না, বুঝলাম না। না, বুঝার চেষ্টা করলাম না। সেটাই বুঝলাম না।

হাটতে হাটতে দিল্লি গেইট পার হয়ে গেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম-আচ্ছা,আপনার সেই আইস্ক্রিমের দোকানটা কোথায়? এরই মধ্যে একটা স্টেশনারি দোকান চোখে পড়লো। সেখানে তেমন আলো নেই। হ্যাজাকের মতো কি যেন জ্বলছে। এই কুয়াশার মধ্যে আগুনের এমন শিখা দেখে একটু গরম অনুভব করলাম। দুজনেই আগুনের শিখার উপর হাত রেখে হাতের তালু গরম করছি। মাঝেমাঝে হাত দুটো গালে নিয়ে আগুনের তাপ নিচ্ছি। এমন সময় বললেন- আচ্ছা দেখি তো, কার হাত বেশি গরম হচ্ছে? আমি বললাম- কিভাবে বুঝবেন? উত্তরে বললেন- আপনি হাত গরম করে আমার কানের লতিতে ধরবেন আর আমি আপনার কানের লতিতে ধরবো। তাহলে বুঝা যাবে কার হাত বেশি গরম হচ্ছে। হ্যাজাকের আগুনের তাপ নিয়ে আমি আমার কান ধরছি। উনি বললেন- আরে, আপনাকে আমার কান ধরতে বলছি।

দোকানদার আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। এক সময় জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, তাড়াতাড়ি বলুন কি লাগবে? এখনি দোকান বন্ধ করে ফেলবো। তিনি বললেন- দুটো হট রেড সিনেম্যন আইস্ক্রিম লাগবে। দোকানদার বললেন – সরি ম্যাম, পাঁচটা ছিল, কিছুক্ষণ আগে চারটা বিক্রি হয়ে গেছে। একটা আইস্ক্রিম নিয়ে দিল্লি স্ট্রিটে আবার হাটতে শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করলাম – কি ব্যাপার, খাচ্ছেন না কেন? আপনার খুবই পছন্দের আইস্ক্রিম। খুব খুশি হয়ে উত্তর দিলেন- এখন খাবো না, আগে আইস্ক্রিম নিয়ে দুজনে একটা সেল্ফি উঠবো, তারপর।

আমার ফোনটা ভুলে রেখে আসছি। তার ফোনে ফ্লাস লাইট কাজ করছে না। দিল্লি স্ট্রিটে মাঝেমাঝে একটা স্ট্রিট লাইট। কুয়াশায় সেটার আলোতেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। একটা পিলারের নিচে সেল্ফি তুলতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু হলো না। হঠাৎ করে মাঝেমধ্যে দু একটা ট্যক্সিক্যাব যাচ্ছে। কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা ট্যক্সিক্যাব আসতেই হাত উঁচু করে থামালেন। আমি একটু রাগ করে বলেই ফেললাম – আরে, পাগল হয়েছেন নাকি! এই রাতে আবার কোথায় যাবেন?

কোন উত্তর না দিয়ে ড্রাইভারকে কী যেন বললেন? তারপর আমার হাত ধরে ট্যক্সিক্যাবের সামনে নিয়ে গেলেন। চোখ দিয়ে ইশারায় করতেই, ড্রাইভার আমাদের ফেসের উপর হেডলাইটের আলো ফেললেন। তার ডান হাত আমার কাধের উপর দিয়ে আইস্ক্রিমটা মুখের সামনে ধরে আছেন।দুজনের মুখের মাঝখানে তেমন দূরুত্ব নেই। হালকা বাতাসে তার সাড়া চারটা চুল আমার ফেসের উপর দিয়ে উড়ছে। মানে পাচটার মধ্যে একটা চুল হাল্ফ ছিল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম- আচ্ছা, কি শ্যাম্পু ব্যবহার করেছেন? মুখটা ডান দিকে ঘুরিয়ে কিছুটা বিরক্তি ভাব নিয়ে বললেন- এখন কি এই এই প্রশ্ন করার সময়? তারপর বাম হাতে মোবাইল নিয়ে সেল্ফি তোলার চেষ্টা করতেই ডান থেকে আইস্ক্রিমটা নিচে পরে গেলো।

লেখক- প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ।

Website |  + posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *